
মেহেদী হাসান পুঠিয়া (রাজশাহী)।।
অভাবের সংসারে একরাশ স্বপ্ন নিয়ে মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়েছিল রুকসানা খাতুন। এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়ে রাজশাহী শহরের নামী কলেজে ভর্তির সুযোগও মিলেছে। কিন্তু সেই সাফল্যের আনন্দ এখন অনেকটাই ম্লান। অর্থের অভাবে কেনা হয়নি বই-খাতা, জোটেনি শহরে থাকার জন্য মেস। অন্য দিকে, কিডনির অসুখে আক্রান্ত মায়ের চিকিৎসা করানোর সামর্থ্যও নেই পরিবারের। ফলে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন পূরণ হওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে পুঠিয়ার সিংড়া গ্রামের এই মেধাবী ছাত্রীর জীবনে।
রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার সিংড়া গ্রামের বাসিন্দা রুকসানা খাতুন ধোপাপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্রী ছিল। তার বাবা নূর মোহাম্মদ পেশায় দিনমজুর। পরিবারের আর্থিক অবস্থা এতটাই খারাপ যে, বসবাসের জন্য রয়েছে মাত্র দু’টি টিনের ঘর। কোনও রকমে দিন কাটে পরিবারের সদস্যদের।
বিদ্যালয়ে পড়ার সময় প্রতিবেশী ও শিক্ষকদের সহযোগিতায় পড়াশোনা চালিয়ে গিয়েছে রুকসানা। এমনকি এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণের টাকাও জোগাড় হয়েছিল তাঁদের সাহায্যে। প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করেই পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পায় সে। পরে রাজশাহী সিটি কলেজে ভর্তির সুযোগ আসে। কিন্তু কলেজে ভর্তি হওয়াই যে উচ্চশিক্ষার পথে শেষ কথা নয়, তা এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে রুকসানার পরিবার।
রাজশাহী শহরে থেকে পড়াশোনা চালাতে গেলে প্রয়োজন থাকা-খাওয়া, বই-খাতা ও যাতায়াতের খরচ। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি দিনমজুর বাবা। তাঁর সামান্য আয়ে সংসার চালানোই দায়। ফলে কলেজে ভর্তি হলেও প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ কেনা কিংবা শহরে থাকার ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়নি। বাড়ি থেকে প্রতিদিন যাতায়াত করেও নিয়মিত পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া কঠিন।
রুকসানার জীবনের এই সঙ্কটের সঙ্গে যোগ হয়েছে মায়ের অসুস্থতা। তার মা রাফিয়া বেগম বেশ কয়েক বছর ধরে কিডনি রোগে ভুগছেন। গত ১৮ অক্টোবর পুঠিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে তাঁকে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় চিকিৎসকেরা তাঁকে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন। কিন্তু অর্থের অভাবে মাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া কিংবা প্রয়োজনীয় ওষুধ কেনার সামর্থ্য হয়নি পরিবারের। বাধ্য হয়ে অসুস্থ মাকে বাড়িতে ফিরিয়ে আনেন নূর মোহাম্মদ।
একদিকে মেয়ের পড়াশোনা, অন্যদিকে স্ত্রীর চিকিৎসা—দুইয়ের খরচ জোগাড় করতে গিয়ে অসহায় হয়ে পড়েছেন দিনমজুর বাবা। সংসারে অভাবের কারণে রুকসানার উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন এবং মায়ের চিকিৎসা, দু’টিই এখন অনিশ্চয়তার মুখে।
এর আগে এসএসসিতে জিপিএ-৫ পাওয়ার পর অর্থের অভাবে রুকসানা যখন কলেজে ভর্তি হতে পারছিল না, তখন তার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন পুঠিয়ার তৎকালীন সহকারী কমিশনার (ভূমি) শিবু দাশ। তাঁর সহযোগিতায় কলেজে ভর্তি হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। তবে ভর্তি প্রক্রিয়া শেষ হলেও পরবর্তী পড়াশোনার খরচ কীভাবে চলবে, তা নিয়ে দুশ্চিন্তা কাটেনি রুকসানা ও তার পরিবারের।
রুকসানার কথায়, “আমার আরও তিন বোন রয়েছে। তাঁদের বিয়ে হয়ে গেছে। তাঁদের আর্থিক অবস্থাও ভাল নয়। তাই তাঁরা সেভাবে সাহায্য করতে পারেন না। কিন্তু আমি থেমে যেতে চাই না। পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চাই। বড় হয়ে পরিবার, দেশ ও জাতির কল্যাণে কাজ করতে চাই।”
ধোপাপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মতিউর রহমান (মন্টু) বলেন, “স্কুলে পড়ার সময় আমরা বিভিন্নভাবে রুকসানাকে সাহায্য করেছি। এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণের টাকাও দিয়ে তাকে পরীক্ষায় বসার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এই মুহূর্তে কেউ তার পাশে দাঁড়ালে মেয়েটি অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারবে।”
মেধা ও অধ্যবসায়ের জোরে সাফল্য পেলেও আর্থিক অনটন রুকসানার পথ আটকে দিয়েছে। প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পেলে তার পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া এবং অসুস্থ মায়ের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা সম্ভব হতে পারে। এখন প্রশ্ন, রুকসানার স্বপ্ন বাঁচাতে এবং তার মায়ের চিকিৎসার জন্য সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবেন কি কেউ? #


















