হোমনায় সার্কেল এএসপির মানবতা, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে বিত্তবানদের প্রতি আহবান

মো. ইব্রাহিম খলিল, হোমনা, কুমিল্লা ঃ সারা দেশ যখন করোনা ভাইরাসে আতঙ্কিত ঠিক সেই মুহূর্তে হোমনা মেঘনার বিভিন্ন রাস্তা-ঘাট, হাট-বাজার, দোকান-পাট ব্রিজসহ সকল জনসমাগম স্থলে অবাধে ছুটে চলেছেন (হোমনা-মেঘনা সার্কেল) এর সিনিয়র এএসপি মো. ফজলুল করিম।

মানুষকে সচেতন করতে, দোকান-পাট ও রাস্তা-ঘাটে আড্ডা বন্ধ করতে এবং মানুষকে ঘরে ফেরাতে দিনরাত নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন পুলিশের এই কর্মকর্তা। পাশাপাশি মানবিক দিকটিও বেশ গুরুত্বসহকারেই দেখছেন তিনি। এছাড়াও তিনি দেশের এই চরম দুর্দিনে সরকারের পাশাপাশি সমাজের বিত্তবানদেরও গরিব -দুঃখী মানুষের সাহায্যার্থে এগিয়ে আসার আহবান জানান।

জানা গেছে, গত ২৩ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত এফটিআই, সিআইডি, ঢাকায় তার Criminal Intelligence Analisys Course চলার কথা থাকলেও দেশের চলমান সমস্যার (করোনা ভাইরাস ) কারণে গত ২৩ মার্চ বিকাল ০৪:০০ টায় এফটিআই কর্তৃপক্ষ ছাড়পত্র দিয়ে বিদায় করে দেন। রাতে কর্মস্হলে পৌঁছেই তার সার্কেলাধীন প্রথমে মেঘনা থানা এবং পরে হোমনা থানার অফিসারদের সাথে দেখা সাক্ষাৎ করে বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা ও দিকনির্দেশনা প্রদান করেন।

পরের দিন ২৪ মার্চ সকাল থেকে শুরু করেন করোনা ভাইরাস নিয়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম। এখন অফিসে তার খুব কম বসা হয়, বেশিরভাগ সময় কাটে পথে প্রান্তরে, বাজারে আর মাঠে- ঘাটে। হোমনা উপজেলার প্রধান চারটি রাস্তা- ১.হোমনা- গৌরিপুর, ২. হোমনা, বাগমারা- রাজকৃষ্ণপুর, ৩. হোমনা, ঘাড়মোড়া- মুরাদনগর এবং ৪. হোমনা- শ্রীমদ্দি মূলতঃ এই ০৪ টি রাস্তা দিয়েই হোমনা থানা এলাকার সমস্ত গ্রামে যাওয়া যায়।

হোমনা উপজেলা সদরের পর সবচেয়ে ব্যস্ততম বাজার হলো রামকৃষ্ণপুর বাজার, যেটা আবার তিনটি থানার মিলনস্থল যেখানে বিখ্যাত ওয়াই (Y)ব্রিজ অবস্থিত। তিন থানার শেষ প্রান্ত হওয়ায় নজরদারি বা তদারকিও একটু কম। সাংবাদিক সৈয়দ আনোয়ার বাজারের ছবি পাঠিয়ে বললেন, স্যার আমাদের বাজারে যদি একটু আসতেন। এরপর থেকে প্রায় প্রতিদিন রামকৃষ্ণপুর বাজারেও যাচ্ছেন তিনি । আর হোমনা থানার অধিকাংশ এলাকা কাভার করা যায় হোমনা- রামকৃষ্ণপুর রাস্তায় বের হলে। পথিমধ্যে রয়েছে অনেক বাজার। এগুলোর মধ্যে উল্লেখ্য হলো বাগমারা, দড়িচর, দুলালপুর, দৌলতপুর এবং রামকৃষ্ণপুর। এসব এলাকায় প্রায় প্রতিদিনই কড়া নজরদারি করছেন তিনি।

(হোমনা -মেঘনা) সার্কলের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার মো. ফজলুল করিম জানান, হোমনা থেকে বের হয়েই বাগমারা বাজারে প্রথমে সরাসরি একটা চায়ের দোকান দেখা যায়। একজন বয়স্ক মানুষ (বয়স আনুমানিক ৬০/৬৫ হবে) চা, পান, বিড়ি, সিগারেট বিক্রি করেন।

প্রথমদিন-দোকানে ঢুকতেই ১০/১২ জন লোক পালিয়ে যায়। চা দোকানি চাচাকে করোনা ভাইরাসের ভয়াবহতা সম্পর্কে বুঝালাম। শুধু বলল, স্যার ভুল হয়ে গেছে, দোকান বন্ধ রাখব। বললাম, দোকান খোলা রাখেন শুধু চা বিক্রি বন্ধ করেন। কারণ যেখানে চা বিক্রি হয় সেখানে আড্ডা বা জনসমাগম বেশি হয়।এজন্য বর্তমান পরিস্থিতিতে আমরা যারা মাঠে কাজ করছি চায়ের দোকান খোলা রাখতে নিরুৎসাহিত করছি বা বন্ধ করে দিচ্ছি।

দ্বিতীয় দিন গিয়ে দেখি দোকানের শাটার অর্ধেক খোলা। ভিতরে চাচা একা কিন্তু চায়ের চুলা জ্বলছে। দেখেই বলল, বাবা চা বিক্রি করছিনা, নিজে খাবো এই জন্য। আবার বুঝালাম।

তৃতীয় দিন-একই অবস্থা, বললাম চাচা এবারে সবকিছু থানায় নিয়ে যাব। শুধু জ্বল জ্বল চোখে তাকিয়ে থাকে কিছুই বলেনা। মনে মনে বলি, চাচা চালিয়ে যান কিন্তু আড্ডা যেন না হয়।

চতুর্থ দিন- আবার অনেক লোকের আড্ডা, জনসমাগম। এবার চাচাকে উচ্চ কন্ঠে বকাঝকা করলাম। ইতোমধ্যে আড্ডাবাজরা পালিয়েছে, চুলো খুললাম। পাশে এসে চিরকুমার মোস্তফা এসে বললেন, স্যার এবারের মত মাফ করে দেন।

গত ৩১ মার্চ বিকেলে যাবার পথে দেখলাম চাচার দোকান বন্ধ। আসার পথে গাড়ি চাচার দোকান ক্রস করতেই ড্রাইভার মকবুলকে ঝাড়ি দিলাম, বললাম দাঁড়াও। বলল, স্যার চাচার দোকান বন্ধ। দোকানটা বন্ধ দেখে মনটা খারাপ হয়ে গেল, দোকান বন্ধ হোক এটা চাইনি, চেয়েছি আড্ডাটা বন্ধ হোক। একজন মুরুব্বি মানুষ, যার বেঁচে থাকার অবলম্বন শুধু চা বিক্রি, সে কীভাবে চলবে? নিজেকে খুব অপরাধী মনে হচ্ছিল, কোনভাবেই একটু শান্তি পাচ্ছিলাম না। মকবুলকে চাচার খোঁজ নেওয়ার কথা বলতেই বলল, স্যার চাচাকে বলেছি, স্যার আগামীকাল থেকে কিছু চাল ডাল দিবে তখন আপনাকে দিবো।

উল্লেখ্য , কুমিল্লা জেলার সন্মানিত পুলিশ সুপার সৈয়দ নুরুল ইসলাম বিপিএম ( বার), পিপিএম মহোদয়ের দিকনির্দেশনায় আমরা ব্যক্তিগতভাবে প্রতিদিন খেটে খাওয়া কিছু মানুষের মাঝে চাল,ডাল, তেল বিতরণ করার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করেছি। এসপি স্যার আমাদের বার বার অনুপ্রাণিত করেছেন এসময় খেটে মানুষের পাশে দাঁড়াতে। এরই মধ্যে গত সন্ধ্যায় পুলিশ সুপার, কুমিল্লা মহোদয় নচিকেতা’র সেই বিখ্যাত গান, ” ছেলে আমার মস্ত বড় মস্ত অফিসার….. ” ভিডিও গানটি আমাদের WhatsApp group – এ পোস্ট করেছেন। গানটি দেখার পর অপরাধবোধ আরো বেড়ে গেল। ঠিকভাবে ঘুমাতেও পারিনি। মনে হচ্ছিল চাচার সাথে কখন দেখা হবে।
ঘুম থেকে উঠে চাচার দোকানে গিয়ে দেখি চাচা যথারীতি চা বিক্রি করছেন। আর জনসমাগম অন্যান্য দিনের চেয়ে একটু বেশি। চাচা দেখেই বলল, স্যার ভুল হয়ে গেছে। আমাকে সকাল হতে ১২ঃ০০ টা পর্যন্ত চা বিক্রির অনুমতি দেন। আমি ছাড়া রোজগার করার মত কেউ নাই, ছোট ছোট তিন ছেলে আর একমাত্র বিবাহিত মেয়ে সেও আমার কাছে থাকে। আমি গরিব বলে মেয়ে জামাই মেয়েকে ঘরে উঠায় না। কী বলব, বুঝতে পারছি না। শুধু দুটো প্যাকেট (চাল, ডাল) হাতে দিয়ে বললাম, যতদিন এই অচল অবস্থা থাকবে ততদিন আপনার পরিবারের ডাল ভাতের ব্যবস্থা করবো ইনশাআল্লাহ। মতি চাচার মত আপনার / আমার আনাচে কানাচে শত শত মানুষ আছেন, যাদের জীবন অচল হয়ে গেছে, যাদের জীবন থেমে যাবে, করোনা ভাইরাসে নয়, খাবারের অভাবে। তাদেরকে যতই মৃত্যুর ভয় দেখান, তারা নিশ্চিত মৃত্যু জেনেই ঘর থেকে বের হয়। আসুন, সবাই সমস্যা চিহ্নিত করে সমাধানের চেষ্টা করি। তাই সমাজের বিত্তশালীদের অনুরোধ করছি আপনারা এসব খেটে খাওয়া মানুষদের পাশে এসে দাঁড়ান , এখনই সময়।

সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই যুদ্ধে আমরা জয়ী হবো ইনশাআল্লাহ।

“সবাই ঘরে থাকুন, অন্যদেরকে ঘরে রাখতে সহযোগিতা করুন, বাংলাদেশকে নিরাপদ রাখুন”

প্রসঙ্গত, দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে ( হোমনা-মেঘনা) সার্কেলের সিনিয়র এএসপি মো. ফজলুল করিমের ভূমিকাকে সাধুবাদ জানিয়েছেন এলাকার সচেতনমহল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com
%d bloggers like this: