রংপুরের খলিশাকুড়িতে দীর্ঘ আড়াই বছরে হাইটেক পার্ক নির্মাণে নামসর্বস্ব সাইনবোর্ড ছাড়া আর কোনো অগ্রগতি নেই

মো. সাইফুল্লাহ খাঁন,জেলাপ্রতিনিধি , রংপুর : রংপুরে হাইটেক পার্ক নির্মাণের নামে জমি অধিগ্রহণ আর সাইনবোর্ড ছাড়া কোনো অগ্রগতি নেই। ২০১৭ সালের জুলাইয়ে শুরু হয় এ প্রকল্পের কাজ এবং তা বাস্তবায়নে নগরীর ৯নং ওয়ার্ডের খলিশাকুড়ির বিলে ৮ একর খাস জমি বন্দোবস্ত দেয় রংপুর জেলা প্রশাসন। দেড় শ’ কোটি টাকা ব্যয়ে এ হাইটেক পার্ক নির্মাণ প্রকল্পের মেয়াদ এ বছরের জুনে শেষ কথা থাকলেও রংপুরবাসীদের দুর্ভাগ্য যে, গেল আড়াই বছরে জমি অধিগ্রহণ ছাড়া আর কোন কাজই বাস্তবায়িত হয়নি। এ প্রকল্পের আওতাধীন অন্যান্য জেলাগুলোতে নির্মাণ কাজ শেষ ও কোথাও চলমান রয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। তবে রংপুরে এখন পর্যন্ত এ প্রকল্পের নির্মাণ কাজ শুরু না হওয়ায় চরম হতাশায় ভুগছেন এ অঞ্চলের জনগণ। হাইটেক পার্ক বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে রংপুরে ৫ হাজার তরুণ-তরুণীর কর্মসংস্থান,রংপুর ও উত্তর বঙ্গের উন্নয়নে আমূল পরিবর্তনের নানা প্রলোভন দেখিয়ে খলিশাকুড়ি এলাকায় দরিদ্র চাষীদের কাছ থেকে জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ক্ষুব্ধ স্থানীয়রা ।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, হাইটেক পার্কের জন্য ৮ দশমিক ৫৯ একর অধিগ্রহণকৃত জমি পিলার ও কাটা তার দিয়ে ঘিরে রাস্তার পাশে প্রকল্পের তথ্য সম্বলিত একটি নামসর্বস্ব সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। দীর্ঘ আড়াই বছর ধরে পার্কের অধিগ্রহণকৃত জমি পতিত থাকায় পিলারগুলো ভেঙ্গে মাটিতে নুয়ে পড়েছে। কাজের কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় বাধ্য হয়ে দরিদ্র কৃষকেরা এবার সেখানে চাষাবাদ শুরু করেছেন।

খলিশাকুড়ির বাসিন্দা জনতা ব্যাংকের কর্মকর্তা আলহাজ্ব মোফাজ্জল হক দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে ক্রাইম পেট্রোল২৪.কম কে বলেন, এলাকায় কথা বলার মতো তেমন কোনো জনপ্রতিনিধি না থাকায় প্রায় সময়েই আমরা অবহেলিত। ঐতিহ্যবাহী খলিশাকুড়ির হাট আমাদের এলাকায় ছিলো, সময়ের আবর্তনে সেটিও নেই, সবচেয়ে কষ্টের ব্যাপার হলো আমাদের অত্র মৌজায় সরকারি প্রতিষ্ঠান তো দূরের কথা, কোনো প্রকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও নেই। সিটি কর্পোরেশনের অন্তর্গত হলেও এখন পর্যন্ত এ এলাকার বাসিন্দারা সরকারের সুনজরের বাইরে।

তথ্যসূত্রে জানা যায়, এখানে নকশানুযায়ী তিনটি ভবনের মধ্যে ১টি স্টিল স্ট্রাকচারে তৈরি সাত তলা বিশিষ্ট মাল্টিটেনেন্ট ভবন, ২টি তিন তলা বিশিষ্ট ক্যান্টিন ও এ্যাস্ফিথিয়েটার ভবন (স্টিল স্ট্রাকচার) এবং ডরমিটরি ভবন (আরসিসি) থাকবে বিধায় এলাকার উন্নয়কামীরা বলেন, প্রয়োজন হলে এ প্রকল্পের জন্য আরো জমি দিতে প্রস্তুত ব্যক্তি-মালিকেরা। কেননা রংপুরে অবহেলিত জনসাধারণের জীবন ও জীবিকার স্বার্থে নির্মাণ কাজ তরান্বিত করে অতি দ্রুত এই জমির বুকে দেখতে চান তারা বহুতল বিশিষ্ট সেই বহুল প্রত্যাশিত স্বপ্নপূরণের হাই-টেক পার্ক।

এদিকে অত্যাধুনিক এই হাইটেক পার্ক প্রযুক্তিভিত্তিক শিল্পায়ন, তরুণদের কর্মসংস্থান,হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যার শিল্পের উত্তরণ ও বিকাশে সুযোগের দুয়ার খুলে দেবে জানিয়ে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল ও ইঞ্জিনিয়ারিং অনুষদের ডিন ড. আবু কালাম মো. ফরিদ উল ইসলাম বলেন, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে এ অঞ্চলের যুবকেরা একদিকে যেমন কাজের সুযোগ পাবে, অপরদিকে দেশের আইটি বিভাগ আরো প্রসারিত ও জনবান্ধব হবে। ফলে বাংলাদেশে সফটওয়্যার শিল্প অধিকমাত্রায় উৎকর্ষ বৃদ্ধির পাশাপাশি জাতীয় রাজস্ব আয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে পার্কটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

রংপুর হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে রংপুরে পাঁচ হাজার তরুণ-তরুণীর কর্মসংস্থান হবে। এখানে উচ্চ গতিসম্পন্ন ইন্টারনেট সেবা, দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তা কর্তৃক সফটওয়্যার, অ্যাপস, গেমস ও কার্টুন নির্মাণ প্রতিষ্ঠান ও কল সেন্টার গড়ে উঠবে । এছাড়াও তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রশিক্ষিত তরুণ-তরুণীরা আউটসোর্সিং করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে সক্ষম হবে। এসব পার্কে ভারত, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন, সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ডের মতো দেশগুলোর নাম তালিকায় থাকলেও দেশি-বিদেশি- বিশ্বের বিভিন্ন হাইটেক পার্কের বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে নানা রকম উৎসাহ ও সুযোগ প্রদানের খবর জানা গেছে।

হাইটেক কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনা কমিটির পরিচালক হোসনে আরা বেগম বিলম্বের কারণ জানিয়ে বলেন, ‘প্রকল্পটি ভারত সরকারের সহায়তায় হচ্ছে বিধায় সকল কাগজপত্র বারবার এক্সিম ব্যাংক অব ইন্ডিয়াতে পাঠাতে হচ্ছে। আবার সেখান থেকে পাঠাতে হয় ইন্ডিয়ান হাইকমিশনে। এসব প্রসেসের ধীরগতির কারণে প্রকল্পের কাজে সময় লেগে যাচ্ছে।

অর্থ ও প্রশাসন কর্মকর্তা এএনএম শরিফুকুল ইসলাম বলেন, টেন্ডার সাবমিট হয়েছে, চলতি বছরের এপ্রিল থেকে কাজ শুরুর কথা তবে এবিষয়ে তিনি অনিশ্চিত।

উল্লেখ্য, তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে ব্যাপক কর্মসংস্থান বাড়াতে দেশের বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ে হাইটেক, সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক, আইটি ভিলেজ স্থাপনের এসব উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে রংপুরসহ ১২ জেলায় হাইটেক পার্ক স্থাপন করা হচ্ছে। প্রকল্পের আওতাধীন অন্য জেলাগুলো হলো— খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, কক্সবাজার, ময়মনসিংহ, জামালপুর, নাটোর, গোপালগঞ্জ, ঢাকা ও সিলেট। সব প্রকল্প বাস্তবায়নে ২০১৭ সালের ২৫ এপ্রিল মোট ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা প্রাক্কলিত ব্যয় অনুমোদন দেয় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। (এর মধ্যে রংপুরের খলিশাকুড়িতে এ হাইটেক পার্কের জন্য ১৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ) প্রকল্প বাস্তবায়ন প্রাক্কলিত এই ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকার মধ্যে বাংলাদেশ সরকার বরাদ্দ দিয়েছে প্রায় ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। ভারত অর্থায়ন করছে বাকি ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com
%d bloggers like this: