প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে কঠিন পড়াশোনার চাপে শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষার্থীদের

সম্পাদকীয়

প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে কঠিন পড়াশোনার চাপে শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। আজকের শিশুরাই আগামী দিনের ভবিষ্যত। তারাই ভবিষ্যতে দেশের নেতৃত্ব দেবে, দেশকে উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিয়ে যাবে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, এ শিশুদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি বিবেচনায় না নিয়ে তাদের ওপর চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে কঠিন থেকে কঠিনতম পড়াশোনার বোঝা যা বর্তমান প্রজন্মের শিশুদের জন্য বহন করা প্রায় অসম্ভব।

একজন শিশুর শারীরিক সুস্থতার জন্য পড়াশোনার পাশাপাশি পর্যাপ্ত খেলাধুলা ও বিশ্রামের প্রয়োজন। কিন্তু আমরা কি শিশুদের এসব অধিকার নিশ্চত করতে পারছি? নি: সন্দেহে বলা যায়, আমরা তা পারছি না। কারণ একজন প্রাথমিক স্তরের শিশুকে ঘুম থেকে উঠেই যেতে হয় মক্তবে। মক্তব শেষে যেতে হয় কোনো প্রাইভেট টিউটরের নিকট। এরপর তাকে প্রস্তুতি নিতে হয় স্কুলে যাওয়ার। স্কুল ছুটির পর এই শিশুটি ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফেরে। তখন আর তার খেলধুলায় অংশগ্রহণের মতো এনার্জি থাকে না, বিশ্রাম নেওয়ারও সুযোগ থাকে না।আবার সন্ধ্যা হতে না হতেই পড়ার টেবিলে বসার জন্য শুরু হয় অভিভাবকদের চাপ। এমতাবস্থায়, একজন শিশু প্রায় দিশেহারা হয়ে পড়ে। কিন্তু নেই তার প্রতিবাদের ভাষা। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস তাকে নীরবে তা সহ্য করতেই হয়।

এবার আসা যাক, মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের কথায়। এ স্তরের একজন শিক্ষার্থী সকাল ৬ টায় ঘুম থেকে উঠলেও পড়ার টেবিলে বসতে বসতে প্রায় ৭ টা বেজে যায়। ৭ থেকে ৮ পর্যন্ত পড়াশোনা করলেও মাত্র ২টি বিষয়ের পড়া তৈরি করা সম্ভব হয়। এরপর ইংরেজি বিষয় পড়ার জন্য যেতে হয় কোনো প্রাইভেট টিউটরের কাছে। সেখানে কেটে যায় ১ ঘণ্ট। অর্থাৎ ৯ টা বেজে গেল। এসময় সে প্রস্তুতি নিয়ে স্কুলে যেতে যেতে প্রায় ১০ টা বেজে যায়। শুরু হয় স্কুলের কাজ, চলে বিকাল ৪ টা পর্যন্ত। এরপর আবার গণিত বিষয়ের জন্য যেতে কোনো না কোনো প্রাইভেট টিউটরের নিকট। সেখানে আবার কেটে যায় ১ঘণ্টা। অর্থাৎ বেজে গেল বিকাল ৫টা। এ সময় ক্লান্ত শিক্ষার্থীর পক্ষে খেলাধুলায় অংশগ্রহণ করা কি আদৌ সম্ভব? তখন আর বিশ্রাম নেওয়ারও সময় থাকে না। এরপর বেলা ডুবার সাথে সাথেই অভিভাবকগণ ক্লান্ত শিক্ষার্থীটিকে পড়ার টেবিলে বসার জন্য তাগিদ দিতে থাকেন। সন্ধ্যা ৭ টায় কোনো শিক্ষার্থী পড়তে বসে রাত ৯ টা পর্যন্ত পাঠ তৈরি করলেও সর্বোচ্চ তিনটি বিষয়ের পাঠ তৈরি করতে পারে। দেখা গেল, সকালে এবং রাতে মিলে মোট পাঁচটি বিষয়ের পাঠ তৈরি করা সম্ভব হলো। আরো বাকী থাকল তিনটি বিষয়ের পাঠ তৈরী। অর্থাৎ একজন শিক্ষার্থী দৈনিক সর্বোচ্চ ৫ টি বিষয়ের প্রস্তুতি নিয়ে স্কুলে যেতে পারে। তাহলে প্রশ্ন থেকে গেল বাকী বিষয়গলো কীভাবে কাভার করবে?

এবার আসা যাক, সৃজনশীল প্রশ্ন পদ্ধতির কথায়। বর্তমান সৃজনশীল পদ্ধতি কতটা সঠিক ও কার্যকর হয়েছে আমার জানা নেই। এটুকুই জানি, সৃজনশীল মানে নিজ থেকে কোনোকিছু সৃষ্টি করা বা সৃজন করা। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, আগেকার দিনে ইংরেজি দ্বিতীয় পত্রে একটি কম্প্রিহেনশন দেওয়া থাকতো। আর সেখান থেকে ৫টি প্রশ্ন করা হতো কিন্তু প্রশ্নের উত্তরগুলো উহ্য থাকতো। অর্থাৎ সরাসরি কম্প্রিহেনশন থেকে কোনো উত্তর খুঁজে পাওয়া যেতো না। কম্প্রিহেনশনের বিষয়বস্তু অনুধাবন করে শিক্ষার্থীদের প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে হতো। সেখানে ছিল সৃজনশীলতা। বর্তমান সৃজনশীল পদ্ধতিতে কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে হলে আগে ভাগেই উত্তর মুখস্থ করে রাখতে হয়। করণ প্রদত্ত উদ্দীপকে পরোক্ষভাবে কোনো উত্তর থাকে না। যেমন – উদ্দীপকে আখলাক সম্পর্কে আলোচনা করা হলো কিন্তু প্রশ্ন করা হলো ইবাদত কাকে বলে? নি:সন্দেহে এমন প্রশ্নের উত্তর দিতে হলে আগে থেকেই মুখস্থ করে রাখতে হবে।মুখস্থ করেই যদি উত্তর দিতে হয় তাহলে এটি সৃজনশীল প্রশ্ন হলো কীভাবে?

আজ থেকে প্রায় ২০/২৫ বছর পূর্বে ডিগ্রি পর্যায়ের সিলেবাসে ডায়লগ, সিনোনিমস, কমপ্লিটিং সেনটেন্স ইত্যাদি বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু বর্তমানে এসব বিষয় প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এসব বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার পূর্বে কোনো শিক্ষাবিদ একটিবার ভেবে দেখেছেন কি শিক্ষার্থীদের প্রতি কতটা অবিচার করা হয়েছে? আগেকার দিনে ৫ টি এসেই(রচনা), ৮/১০ টি অ্যাপ্লিকেশন, ৮/১০ টি লেটার মুখস্থ করলেই পরীক্ষায় একাধিক কমন পাওয়া যেত। কারণ তখন বিকল্প অপশন ছিল। বর্তমানে এসব প্রশ্নের কোনো বিকল্প নেই। সে কারণে প্রতিটি আইটেমের জন্য ২০ টি করে পড়েও কমন পাওয়া অত্যন্ত কঠিন। এদিক থেকে চিন্তা করলে দেখা যায় বর্তমান পড়াশোনা কতটা কঠিন।

এমতাবস্থায় একজন শিক্ষার্থীর সুস্থভাবে বেড়ে উঠার পরিবেশ সৃষ্টি এবং একটি শিক্ষিত জাতি গঠনের লক্ষ্যে বর্তমান শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের দিকটি বিবেচনায় নিয়ে পড়াশোনার কাঠিন্য কমিয়ে আনা এবং সৃজনশীল প্রশ্ন বাতিল করা একান্ত জরুরি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com
%d bloggers like this: