টাঙ্গাইলের ঘাটাইলে বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ প্রয়োগ করে পাকানো হচ্ছে কাঁঠাল

মো: আ: হামিদ টাঙ্গাইল : বাংলাদেশের জাতীয় ফল কাঁঠাল পাকাতে এখন আর প্রকৃতির ওপর নির্ভর করছে না কেউ। কাঁঠাল ব্যবসায়ীরা কিলিয়ে কাঁঠাল পাকানোর মতো এক ধরনের বিষাক্ত রাসায়নিক দ্রব্য প্রয়োগ করে জোর করেই কাঁঠাল পাকাচ্ছে। টাঙ্গাইলের ঘাটাইলে দুই, তৃতীয়াংশ পাহাড়ী এলাকা থাকায় মৌসুমী ফল, আনারস, আম, কলাসহ ব্যাপক পরিমাণে কাঁঠাল আবাদ হয়। এসব কচি কাঁঠাল পাকাতে তারা নির্বিচারে বিষাক্ত ক্যালসিয়াম-কার্বাইড, ইথাইড, কপার সালফেট, পটাশের তরল দ্রবণ, কার্বনের ধোঁয়া, রাইপেন জাতীয় বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ সরাসরি লোহার শিক দিয়ে কাঁঠালে প্রবেশ করাচ্ছেন। এক কথায় বলতে গেলে সরাসরি বিষ প্রয়োগ করা হচ্ছে। উপজেলার প্রায় ১৯/২০টি বাজারে প্রতিদিন সকালে কাঁঠালের হাট বসে। উপজেলার গারোবাজার, সাগরদিঘী, জোড়দিগী, আষাঢ়িয়াচালা, রামদেবপুর, শহরগোপিনপুর, ধলাপাড়া, দেওপাড়া, দেলুটিয়া, ছনখোলা, চাপড়ী বাজার, পেচারআটা, মাকড়াই, কুশারিয়া, পাকুটিয়া বাজারসহ বেশি কিছু হাটে ব্যাপক পরিমানের কাঁঠাল আমদানি হয়। এসব কাঁঠাল স্থানীয় চাহিদার পাশাপাশি রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিদিন দেড় শতাধিক ট্রাক কাঁঠাল ভর্তি করে বিভিন্ন স্থানে চলে যায়। এ ছাড়াও ঘাটাইলের পাশ্ববর্তী উপজেলা মধুপুর ও সখিপুরেও ব্যাপক পরিমাণে কাঁঠাল উৎপাদিত হয়। অসাধু উপায়ে কাঁঠাল পাকানোর এ পদ্ধতিকে স্থানীয় ভাষায় ‘শিক’ মারা বলে। প্রায় দেড় ফুট লম্বা লোহার শিক কাঁঠালের বোটা বরাবর ঢুকিয়ে দিয়ে ছিদ্র পথে ইনজেকশনের বড় সিরিঞ্জ এর মাধ্যমে কার্বাইড, ইথ্রায়েল, ইথিকন ও রাইপেন জাতীয় বিষাক্ত পদার্থ প্রয়োগ করা হচ্ছে। পরে একজায়গায় কাঁঠাল স্তূপ আকারে সাজিয়ে পলিথিন দিয়ে মুড়িয়ে চাপা দিয়ে রাখলেই ১৮-২৪ ঘন্টার মধ্যেই একটি কচি কাঁঠাল পেকে মিষ্টি পাকা কাঠালের মতো গন্ধ ছড়ায়। দেখে বুঝার কোন উপায় নেই যে এটি একটি অপরিপক্ক বিষাক্ত কাঁঠাল, যেটাকে কেমিক্যাল দিয়ে পাকানো হয়েছে। এসব বিষাক্ত রাসায়নিক স্থানীয় কিটনাশকের দোকানেই পাওয়া যায়। স্থানীয়ভাবে ঘাটাইলের এসব অঞ্চলে গড়ে উঠেছে অসংখ্য দোকান।

কীটনাশক ব্যবসায়ী মোঃ হায়দার আলী জানান, আমরা অনুমোদিত বিভিন্ন কোম্পানীর নিকট থেকে এসব ওষুধ ক্রয় করে থাকি। কোম্পানিগুলো বাহারী রঙের বোতলে আমাদের কাছে এগুলো পৌঁছে দেয়। কাঁঠাল ও আনারসের মৌসুমে প্রতিদিন গড়ে ২৫-৩০ বোতল মেডিসিন বিক্রি হয়। অন্য আরেক ব্যবসায়ী মোঃ সালামত খান প্রায় একই কথা বলেন।

এদিকে ধলাপাড়া বাজারের ঔষধ ব্যবসায়ী মোঃ আঃ হান্নান বলেন, রাসায়নিক পদার্থ প্রয়োগ করে কাঁঠাল পাকালে আমরা যেমন একদিকে সরাসরি বিষ খাচ্ছি অপরদিকে এই অসাধুপন্থা গ্রহণ করার কারণে ঘাটাইলে কাঁঠালের সুনাম নষ্ট হচ্ছে। যার ফলে কাঁঠালের বাজারে মন্দাভাব বিরাজ করছে, কৃষক তার ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

ঘাটাইল গারোবাজারের আরেক কাঁঠাল ব্যবসায়ী বলেন, এক ট্রাক কাঁঠাল ঢাকা নিতে গেলে স্থানীয় দালালদের কমিশন দিতে হয় হাজার টাকা। তাই আগাম মৌসুমে বেশি লাভের আশায় আমরা কাঁঠালে রাসায়নিক দ্রব্য মিশিয়ে থাকি। রাসায়নিক দ্রব্য দিয়ে কাঁঠাল পাকানো নিয়ে তিনি আরো বলেন, ঢাকা শহরে কেউ কাঁচা কাঠাল কিনতে চায় না। সবাই পাকা কাঁঠাল চায় । বর্তমানে এ ব্যবস্থায় কাঁঠাল পাকানোর ফলে কাঁঠালের বাজার মন্দা এবং ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন কৃষক।

এ ব্যপারের ঘাটাইল উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. সাইফুর রহমান খান জানান, এসব রাসায়নিক দ্রব্য মিশ্রিত কাঁঠাল খেলে আমাশয়, লিভারডিজিস, রাতকানা, শ্বাসকষ্ট ও অ্যাজমাসহ ক্যানসারের মতো জটিল ও কঠিন রোগ হতে পারে। বিশেষ করে শিশুদের জন্য এটা মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে। এসব খাদ্য গ্রহণ না করাই ভাল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com
%d bloggers like this: