ঝিনাইদহে মাত্রাতিরিক্তভাবে বাড়ছে ধর্ষণ ও নির্যাতন

ঝিনাইদহ প্রতিনিধি >>
ঝিনাইদহ জেলা পুলিশের তথ্য মতে, ২০১৬ সালে ধর্ষণ মামলা হয় ১৮টি, নির্যাতন মামলা ৯০টি, ২০১৭ সালে ধর্ষণ মামলা ২৪টি, নির্যাতন মামলা ১১৬টি, ২০১৮ সালে ধর্ষণ মামলা ৩১টি, নির্যাতন মামলা ১০৪টি, ২০১৯ সাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত ধর্ষণ মামলা হয়েছে ৩০টি, নির্যাতন মামলা ১০০টি।

মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের তথ্যে ২০১৬ সালে নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে ১১২টি, ২০১৭ সালে ১০৮টি, ২০১৮ সালে ৯৫টি এবং ২০১৯ সালের বর্তমান সময় পর্যন্ত ৪৫টি।

সদর হাসপাতালের তথ্যে ২০১৬ সালে ৪৭টি, ২০১৭ সালে ৭৭টি, ২০১৮ সালে ৯৮টি এবং ২০১৯ সালের বর্তমান সময় পর্যন্ত প্রায় ৮০টি ধর্ষণ বিষয়ে ডাক্তারি পরীক্ষা করানো হয়েছে। প্রায় দুই মাস আগে মহেশপুর উপজেলার কালুহুদা গ্রামে স্থানীয় একটি স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির এক ছাত্রীকে টাকার প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণের চেষ্টা করে গ্রাম্য চিকিৎসক আব্দুল গফুর। এ ঘটনায় তাকে ধরে থানায় নিয়ে গেলেও রাতেই ছেড়ে দেয় পুলিশ। ঘটনার পরদিন গ্রাম্য মাতব্বর সানোয়ার হোসেন ২০ হাজার টাকার বিনিময়ে ভয়ভীতি দেখিয়ে মামলাটি মিটিয়ে ফেলে। এ দিকে জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার কোলাবাজার এলাকার এক স্কুলছাত্রী মুঠোফোনে কথা বলার জেরে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে স্থানীয় বখাটে মিরাজের সঙ্গে। পরে মিরাজসহ তিনজন ওই ছাত্রীকে বাড়ির পার্শ্ববর্তী মাঠে নিয়ে রাতভর গণধর্ষণ করে। এ ঘটনায় পরদিন ওই ছাত্রীর বাবা কালীগঞ্জ থানায় মামলা দায়ের করলে দুই আসামিকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তবে প্রধান আসামি মিরাজকে গ্রেফতার করতে পারেনি তারা। এভাবে বিভিন্ন সময় নানাভাবে ধর্ষণ, নির্যাতনের মতো ঘটনাগুলো ঘটে চলেছে। প্রভাবশালীদের চাপে এভাবে দিনের পর দিন ন্যায় বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। কিছুদিন এসব নিয়ে হৈচৈ চলে পরে আবার ধামাচাপা পড়ে যায়, সৃষ্টি হয় নতুন কোনো ঘটনা।

ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালের গাইনি বিশেষজ্ঞ ডা. মার্ফিয়া খাতুন বলেন, বিভিন্ন সময় হাসপাতালে ভিকটিমরা আসে। আমরা তাদের ডাক্তারি পরীক্ষা করি। এক্ষেত্রে দেখা যায়, অনেকেই পরিবারের অগোচরে বিয়ে করে। হয়তো তারা এক সঙ্গে থাকে। যখন পরিবার বিষয়টি জানে তখন ধর্ষণ মামলা হয়। এই কেসগুলো তো জেনুইন না। কেননা তারা বিবাহিত, তাদের ভেতর দৈহিক সম্পর্ক হতে পারে। আবার কিছু আসে যারা সেক্স হ্যাবিচুয়েটেড। একাধিক মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক থাকে। কিছু কেস আবার আসে গ্রাম্যভাবে বা সামাজিকভাবে একে অন্যকে ফাঁসাতে ধর্ষণ মামলা দেয়। এক্ষেত্রে পরীক্ষা করে কোনো আলামত পাওয়া যায় না। তবে মোটের ওপর ৩০ শতাংশ কেস থাকে যা জেনুইন।

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. নাসিমা বানু বলেন, অভিভাবকদের মধ্যে সচেতনতার অভাব রয়েছে। তারা খেয়াল রাখছেন না সন্তানের দিকে। ফলে শিশুরা নানা অসামাজিক কাজে জড়িয়ে পড়ছে। তিনি আরও বলেন, প্লেগ্রুপ থেকেই শিশুদের সচেতনতামূলক মুভমেন্ট শুরু করতে হবে যখন বাচ্চারা খেলার ছলে শিখবে, তাদের শিখিয়ে দিতে হবে ছেলে-মেয়ে সকলেই সমান। এই সচেতনতাবোধ যখন তারুণ্যের মধ্যে জাগ্রত হবে, বাবা-মাসহ মানুষ যখন সচেতন হবে তখন আর নারী নির্যাতন বা ব্ল্যাকমেইল এর মতো প্রসঙ্গটা আর থাকবে না। পাশাপাশি বয়স ভেদে ইন্টারনেট ব্যবহারও নিয়ন্ত্রণ করা দরকার।

মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের জেলা প্রোগ্রাম অফিসার শরিফা আক্তার বলেন, সচেতনতার অভাব, আর্থিক দৈন্যতা, সামাজিক-রাজনৈতিকসহ নানা কারণে এই ঘটনাগুলো হর হামেসাই ঘটছে। নারী নির্যাতন প্রতিরোধে কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। তবে প্রশাসনের মতো সরাসরি আইন প্রয়োগের ক্ষমতা না থাকায় আমরা কিছুটা পিছিয়ে আছি।

পুলিশ সুপার মো. হাসানুজ্জামান জানান, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের অধীনে অপরাধের ক্ষেত্রে দ্রুততার সঙ্গে ভুক্তভোগী পরিবারের ন্যায় বিচার প্রাপ্তির ক্ষেত্রে আমরা আইনগত ব্যবস্থা নেই। এ ধরনের অপরাধ গ্রাম্যভাবে মীমাংসার কোনো বিধান নেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *