ইলিশের প্রজননকালে ধূম্রজাল : কৃষিবিদ আবুল কাশেম

মো. সাইফুল্লাহ খাঁন, জেলা প্রতিনিধি, রংপুর :

ইলিশ যেন লুকোচুরি খেলছে, অনেক জায়গায় ইলিশের হরেক রকম  খেল পরিলক্ষিত হচ্ছে। এ মাছটি গবেষকদের দৃষ্টিতে প্রজননকালে এমন খেলাই খেলছে ঠিক যেন চারদিকে ধূম্রজাল ছড়িয়ে পড়ছে বলে জানিয়েছেন  রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারীজ বিভাগের কৃষিবিদ আবুল কাশেম। তিনি বলেন,  ইলিশ নিয়ে গবেষণায় গবেষকগণ অবিরাম প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন এবং সময়োপযোগী পদক্ষেপের কারণে মাছটির উৎপাদন দিন দিন বেড়েই চলছে।  বর্তমানে তা ৫.১৭ লক্ষ মেট্রিক টন ছড়িয়ে গেছে যা জিডিপির ১ শতাংশ। তাই এ উৎপাদনকে স্থিতিশীল করতে হলে যেমন সময়োপযোগী পদক্ষেপ নিতে হবে তেমনি সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে  নতুন নতুন সিদ্ধান্ত গ্রহন করতে হবে।
আপনারা জানেন চলতি বছরের ৯অক্টোবর হতে ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত মোট ২২ দিন ইলিশ আহরণ নিষিদ্ধ ছিল। ইলিশ ধরার এই নিষিদ্ধ কাল অতিক্রান্ত হওয়ার পর এখন জেলেরা মাছ ধরা শুরু করেছে। কিন্তু বহু জায়গা হতে এখন পর্যন্ত খবর আসছে ধৃত ইলিশে ডিম পাওয়া যাচ্ছে। এখন অনেকেই সংশয় প্রকাশ করছেন  ইলিশের প্রজনন মৌসুম পাল্টে গেছে কিনা? এ সিদ্ধান্তে আসতে হলে অবশ্যই  আরো কিছুটা  গবেষণার প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করছি। হয়তো সামনের দিনগুলোতে আশানুরূপ ফল পাওয়া যাবে। এব্যাপারে আমরা গবেষকসমাজ থেমে নেই, অল্প কিছুদিনের মধ্যেই  ইলিশের এই রহস্য উদঘাটিত হবে এমন প্রত্যাশা করছি।   ইলিশ নিয়ে গবেষণায় আপাতত আপনাদের সম্মুখে আমার গবেষণালব্ধ বাস্তব অভিজ্ঞতা প্রকাশ করছি… আমি কক্সবাজার জেলার মহেশখালী উপজেলায় অবস্থানকালে দেখতে পেলাম ইলিশ আহরণ নিষিদ্ধ করার আগে অনেক মাছে ডিম এসেছে। এসব মাছ আকারে ছোট এবং ওজনে প্রায় ৩০০-৪৫০ গ্রাম। আবার নিষিদ্ধ সময় শেষে নিয়মিত বাজার পর্যবেক্ষণ করে দেখেছি ডিমওয়ালা ইলিশ নেই। কিন্তু বিভিন্ন নদী থেকে ধৃত ইলিশে ডিম পাওয়া  যাচ্ছে বলে এখনও খবর পাওয়া যাচ্ছে! এসব ঘটনা দেখে মনে হয়েছে-

প্রথম: যে কোনো কারণে ইনব্রিডিং আবহাওয়াগত, দূষণ বা পরিবেশগত) ইলিশের গোনাডাল ম্যাচুরিটি দ্রুত হচ্ছে ফলে অনেক ছোট (৩০০-৪০০ গ্রাম) ইলিশে ডিম আসছে।

দ্বিতীয়: ইলিশ বয়সভেদে বিভিন্ন সময় প্রজননে অংশগ্রহণ করছে। ফলে ফাস্ট এজ গ্রুপ আগে এবং পরবর্তী এজ গ্রুপ পরে প্রজননে অংশগ্রহণ  করছে।

তৃতীয়: সমুদ্রের কাছাকাছি অবস্থানরত ইলিশের গোনাডাল ম্যাচুরিটি আগেই আসছে এবং দূরবর্তী স্থানের ইলিশের ম্যাচুরিটি সম্ভবত বিলম্বিত হচ্ছে। ফলে সমুদ্র থেকে  নিকটবর্তী স্থানে অবস্থানরত ইলিশ আগে এবং দূরবর্তী নদীতে অবস্থাণরত  ইলিশ পরে প্রজননে  অংশগ্রহণ করছে। এবিষয়ে আমার গবেষণা অব্যাহত আছে।

বর্তমানে করনীয়ঃ
অনেক নদী ভরাট করার পাশাপাশি বিভিন্নভাবে  দূষিত হওয়ার কারণে ইলিশের অবাধ অভিগমন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এ কারণে বিভিন্ন স্থানের ব্রুডের মধ্যে হেটারোজেনেসিটি তৈরি হচ্ছে না বিধায় আন্তঃপ্রজননের ঘটনা ঘটছে এবং ছোট ইলিশে ডিম চলে আসছে। অপরদিকে  তাপমাত্রা বৃদ্ধি, যথাসময়ে বৃষ্টিপাত না হওয়া ও দূষণ ইত্যাদি পরিবেশগত কারণে এই মাছটির প্রজননকালে পরিবর্তন আসতে পারে। তবে এখন আর ইলিশের প্রজননকাল ২২ দিনে নির্দষ্ট রাখার সুযোগ নেই। এজন্য ২২ দিনের শুরুর ৭ দিন আগে এবং শেষে ৭ দিন যোগ করে মোট ৩৬ দিন ইলিশের প্রজননকাল ঘোষণা করা উচিত।  তবে এ বিষয়ে সিদ্ধান্তে আসার আগে আরো পর্যাপ্ত  গবেষণার প্রয়োজন আছে বলে মনে করি।  ইলিশের প্রজননকাল নির্দিষ্ট করা গেলে  সফল প্রজনন সম্পন্ন করা সম্ভব, তখন ইলিশই হবে প্রধান সামুদ্রিক সম্পদ। আর নীল অর্থনীতির ( ব্লু ইকোনমি) স্বপ্ন পূরণে আরো এক ধাপ এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com
%d bloggers like this: