আধুনিক বিশ্বে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের প্রদান করা হয় বেতন আর এমপিওভুক্ত বাংলাদেশের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের প্রদান করা হয় অনুদান !

আধুনিক বিশ্বে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতন প্রদান করা হলেও এমপিওভুক্ত বাংলাদেশের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের প্রদান করা হয় অনুদান ! বহি:র্বিশ্বে সর্বোচ্চ সম্মান ও আর্থিক সুবিধা দেয়া হয় যাতে করে মেধাবীরা শিক্ষকতা পেশায় এগিয়ে আসে। আমেরিকায় শিক্ষকদের সম্মানী দেয় অঞ্চল ভেদে, যেখানে জীবন যাত্রার জীবন ব্যয়বহুল, সেখানে বেতন ও বেশি। নিউইয়র্কে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বার্ষিক ইউএসডি ৮০,৫৪০.০০ ডলার আর মেরিল্যান্ডে দেওয়া হয় বার্ষিক ৬৭, ৩৪০.০০ ডলার।
অপরদিকে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বার্ষিক বেতন নিউইয়র্কে ৮০,৯৪০.০০ ডলার আর ইলিনয় অঙ্গ রাজ্যে বার্ষিক বেতন ৬৬,৬৩৬.০০ ডলার।
তবে সাধারণ রেঞ্জ হলো সর্বনিম্ন বার্ষিক বেতন ১৬,০০০.০০ ডলার আর সর্বোচ্চ বার্ষিক বেতন ১,০০,১০০.০০ ডলার। ইউরোপের দেশ ফ্র্যান্সে প্রাথিমক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বার্ষিক বেতন ৪১,৮৫৮ ইউরো। মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বার্ষিক বেতন সর্বনিম্ন ৩০,২১৬.০০ ও সর্বোচ্চ ৫১,৪৫৩.০০ ইউরো, শ্রীলংকায় মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতন সর্বনিম্ন মাসিক বেতন ৪৫,৬০০.০০ শ্রীলংকান রপি, আর সর্বোচ্চ মাসিক বেতন ১,৭৪,০০০.০০ শ্রীলংকান রুপি ।

আজও আমাদের দেশে মানুষ গড়ার কারিগররা সরকারি কোষাগার থেকে বেতন পায় না, পায় অনুদান! আর এই অনুদান পাওয়া যায় প্রতিমাসের ১০-১৫ তারিখে।
শিক্ষকতা পেশা ভিক্ষাবৃত্তি নয় যে, তাদেরকে অনুদান দিতে হবে। বেসরকারি শিক্ষকরা সরকারি শিক্ষকদের সমযোগ্যতা ও দক্ষতা নিয়ে সমপরিমাণ কাজ করলেও আর্থিকভাবে চরম বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। এটা চলতে পারে না। তাছাড়া দেশের প্রায় ৯৫ ভাগ শিক্ষকই বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত । এসব প্রতিষ্ঠানে পাঁচ লাখের বেশি শিক্ষক-কর্মচারী কর্মরত আছেন। আর বাকি ৫ ভাগ সরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছেন।সরকারি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রেও আসন থাকে সীমিত। সে কারণে প্রতিযোগিতামূলক ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে অতি মেধাবী স্বল্পসংখ্যক শিক্ষার্থী ভর্তির সুযোগ পায়। অবশিষ্ট স্বল্পমেধাসম্পন্ন ও প্রায় মেধাশূন্য শিক্ষার্থীদের ঠাঁই হয় দেশের বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। আর সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া শিক্ষার্থীদের যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার মহান দায়িত্বটুকু গ্রহণ করেন দেশের অবহেলিত বেসরকারি শিক্ষক সমাজ।বেসরকারি শিক্ষকদের অবহেলিত রেখে পুরো শিক্ষা ব্যবস্থায় গুণগত পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়।

এমপিওভুক্ত মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মাসিক বাড়ী ভাড়া টাকা ১০০০.০০ (এক হাজার টাকা), মাসিক চিকিৎসা ভাতা টাকা ৫০০.০০ (পাঁচশত টাকা) , দুটি উৎসব বোনাস মূল বেতনের ২৫%, বৈশাখী ভাতা মূল বেতনের ২০%, নেই কোনো পেনশন ব্যবস্থা, নেই টাইম স্কেল,নেই অর্জিত ছুটি ভাতা,নেই তাদের সন্তানদের শিক্ষা ভাতা, নেই টিফিন ভাতা, নেই বদলী ব্যবস্থা, ১০% কর্তনের বিনিময়ে আছে নাম মাত্র অবসর ও কল্যাণ ভাতা। যে কল্যাণ আর অবসর ভাতা ৯০% শিক্ষক বেঁচে থাকতে তুলতে পারেন না। এখানে এতো জটিলতা যে ঘুরতে ঘুরতে পায়ের পাতা পর্যন্ত ক্ষয়ে যায়, তবু ভাতার দেখা আর হয় না। অবশেষে ধুকে ধুকে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে এ দেশের বেশির ভাগ এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারী। এ দুঃখের করুণ কাহিনী আজ কারো বিবেককে নাড়া দেয় না, শিক্ষকরা যেনো আজ এ জাতির তামাসার পাত্র!
নিজের অর্থায়নে মহাকাশে স্যাটেলাইট প্রেরণ করেছেন, পদ্মা সেতুর কাজ সমাপ্তির পথে, রূপপুর মেগা বিদ্যুত প্রকল্পে চলছে হরিলুট, সাতশত কোটি টাকা ব্যয়ে শিক্ষাটিভি স্থাপনের বাজেট প্রনয়ণ হচ্ছে। শুধু বাদ থেকে যাচ্ছে এমপিওভুক্ত শিক্ষা ব্যবস্থা জাতীয়করণ করার পরিকল্পনা।
কোনো দেশ বা জাতি উন্নত করতে হলে সে দেশের শিক্ষার ভিত্তি মজবুত করা প্রয়োজন সবার আগে। শিক্ষিত জাতি তৈরি করতে পারলে সে দেশ উন্নত হতে বাধ্য।আর শিক্ষিত জাতি গড়তে বৈষম্যমুক্ত শিক্ষা ব্যবস্থা অপরিহার্য। সরকারি সকল চাকুরীজীবী স্থান ভেদে বাড়িভাড়া পেয়ে থাকেন তার মূল বেতনের ৪৫% থেকে ৬০% । যেমন : একজন সরকারি চাকুরীজীবী প্রত্যন্ত গ্রামীন অঞ্চলে হলে বাড়িভাড়া পেয়ে থাকেন ৪৫% আবার যদি পার্বত্য এলাকায় চাকরী করেন তখন বাড়িভাড়া পেয়ে থাকেন ৬০%। এভাবে জেলা শহর, বিভাগীয় শহর,রাজধানী শহর বিভিন্ন জায়গায় বাড়িভাড়া বিভিন্ন রকম হয়ে থাকে।সেখানে এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা প্রতিষ্ঠান প্রধান থেকে পিয়ন পর্যন্ত সবাই পেয়ে থাকেন ১০০০ টাকা এখানে কোনো % অনুসরণ করা হয় না।
এরপর আমি বলবো উৎসব ভাতার কথা। আজ থেকে এক যুগের বেশি সময় ধরে শিক্ষকরা উৎসব ভাতা পেয়ে থাকেন।কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় এই যে, উৎসব ভাতা পেয়ে থাকেন তার মূল বেতনের ২৫% আর কর্মচারীরা পেয়ে থাকেন মূল বেতনের ৫০%। ফলে দেখা যায় একজন ১২৫০০ বা টাকা ১৬০০ টাকা স্কেলের একজন শিক্ষক ৮২৫০ টাকা স্কেলের একজন পিয়নের চেয়ে কম টাকা উৎসব ভাতা পেয়ে থাকেন। যা তার উপর মর্যাদার প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। ২৫% উৎসব ভাতায় একজন শিক্ষকের পক্ষে কি তার পরিবার- পরিজন নিয়ে উৎসব পালন করা সম্ভব ? একজন শিক্ষক ৩০০০টাকা বা ৪০০০ টাকায় কি একটি ন্যূনতম পশু ক্রয় করতে পারবেন? এই প্রশ্নের উত্তর আমি জাতির কাছে রাখলাম।

সরকারের নীতি-নির্ধারকদের কাছে আমার পরামর্শঃ

১. শিক্ষকদের মাসিক অনুদান না দিয়ে কোষাগার থেকে মাসিক বেতন প্রদান করুন অর্থ্যাৎ সমস্ত বেসরকারি মাধ্যমিক ও উচ্চ বিদ্যালয়গুলোকে জাতীয়করণ করুন।
২. এই পেশায় যাতে মেধাবীরা আসতে আগ্রহী হয় তার জন্য স্বতন্ত্র পে-স্কেল গঠন করুন।
৩. অধিকতর দক্ষতা অর্জনের জন্য উচ্চতর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করুন এবং প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণকারীদের উপযুক্ত ভাতা প্রদান করুন।
৪. স্বচ্ছতার সাথে বদলীর ব্যবস্থা করুন।
৫. শিক্ষক সারাটি জীবন বিদ্যা বিতরণ করে অথচ বিদায়ের সময় খালি হাতে বিদায় নেয়, অর্থ্যাৎ অবসরের সময় যথাযথ কালীন ও মাসিক পেনশনের ব্যবস্থা করুন।
৬. বাৎসরিক ইনক্রিমেন্ট ১০% করুন।
৭. দেশের আর্থ-সামাজিকতার সাথে তাল রেখে যৌক্তিক বাড়ি ভাড়া, উৎসব ভাতা, বৈশাখী ভাতা প্রদান করুন।

শিক্ষার্থীদের পড়ানো বা বুঝানা একটি জটিল কাজ, এই কঠিন দায়িত্বটা যেহেতু তাঁরা কাঁধে নিয়েছেন, সুতরাং তাঁদেরকে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করতে না পারলে জাতি শিক্ষার সুফল কখনো পাবে না।

লেখক : মোহাম্মদ মোশারফ হোসেন, প্রিন্সিপাল অফিসার, আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড,
খিলক্ষেত শাখা, ঢাকা। ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : ক্রাইম পেট্রোল২৪.কম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com
%d bloggers like this: